কীসের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল?

বাঙালি জাতীয়তাবাদ

পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন মূলত বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন ছিল, যা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়েছিল। মূল কারণগুলো নিম্নরূপ—

১. বাংলা ভাষার প্রতি অবিচার ও বঞ্চনা
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত হয়। কিন্তু জনসংখ্যার প্রায় ৫৬% বাংলা ভাষাভাষী হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করে। এ সিদ্ধান্ত বাঙালি জনগণের জন্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অসম্মানজনক ছিল।

২. পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যবাদী নীতি
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ভাষার পাশাপাশি প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল। বাংলা ভাষাকে অবহেলা করে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সেই আধিপত্যবাদেরই অংশ।

৩. ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণা
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” তার এই ঘোষণা বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করে এবং ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়।

৪. সরকারের দমন-পীড়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ
ভাষার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন গড়ে উঠলেও পাকিস্তান সরকার তা দমন করার চেষ্টা করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়, এতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন।

৫. বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান
ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার দাবি ছিল না, এটি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সুস্পষ্ট প্রকাশ। এই আন্দোলন থেকেই পরে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

ফলাফল
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

ভাষা আন্দোলন তাই কেবল একটি ভাষার লড়াই ছিল না; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব এবং স্বাধীনতার পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *